খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে উন্নত বীজের বিকল্প নেই: মোস্তাফিজুর রহমান প্রকাশিতঃ ৯:৪৮ অপরাহ্ণ, শনি, ৯ মে ২০. সময় জার্নাল

সময় জার্নাল প্রতিবেদক: সৃষ্টির পর থেকে বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নানা জটিল রোগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রলয়, আগ্নেয়গিরির কারণে সৃষ্ট মহামারি মানুষের জীবনমানের অনেক পরিবর্তন করেছে। তবে একসাথে পৃথিবীতে মহাবিপর্যয় এসেছে প্রতি শত বছরে একবার করে। যেমন ১৭২০ সালে প্লেগ, ১৮১৭ সালে কলেরা, ১৯২০ সালে স্পেনিশ ফ্লু ও ২০১৯-২০ এ কোভিড-১৯। এসব মহামারির ফলে সৃষ্ট দুর্যোগ পৃথিবীর অর্থনৈতিক হিসাব নিকাশ উলট পালট করে দিয়েছে।

বর্তমানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রতিদিন মৃত্যুর মিছিলে যোগ হচ্ছে হাজারো মানুষ। লকডাউন হয়ে পড়েছে প্রতিটি রাষ্ট্র। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস’সহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, করোনা আতঙ্কে অধিকাংশ বড় কোম্পানির কারখানায় উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। এভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে।

করোনার প্রভাবে ইতোমধ্যে বিশ্বের খাদ্য ব্যবস্থাপনা চেইন ভেঙে পড়েছে। অতীতের সকল দুর্ভিক্ষের সময় বিশ্বের কোথাও কোথাও এই খাদ্য চেইন ঠিক থাকা সত্ত্বেও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। করোনা পরবর্তী ভঙ্গুর সাপ্লাই চেইন এর কারণে বিশ্বের এই বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য চাহিদা পূরণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। এসময় বিশ্বজুড়ে খাদ্য ঘাটতি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

করোনা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে খাদ্য সংকট থেকে রক্ষায় কৃষিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ওয়ান ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএসএম মোস্তাফিজুর রহমান। সময় জার্নালের সঙ্গে একান্ত আলাপে তিনি বলেন, কৃষিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হলে সবার আগে সরকারকে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। এজন্য প্রণোদনার দিয়ে উন্নতমানের বীজসহ সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ কৃষকের জন্য সাশ্রয়ী করতে হবে। প্রয়োজনে উন্নতমানে বীজ কৃষককে বিনামূল্যে সরবরাহ করতে হবে। কারণ কৃষক বাঁচলেই আমাদের খাদ্যের অভাব দূর হবে।

সরকারকে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে কৃষিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কৃষি উৎপাদন যেহেতু বীজ দিয়ে শুরুই হয়, সেহেতু সরকারকে প্রথমে কৃষকের হাতে উন্নতমানের বীজ পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বীজকে কেমিক্যালি ট্রিটমেন্ট করে দেয়া যেতে পারে, যাতে কৃষক বীজগুলোকে খাদ্য হিসেবে বা অন্য কোন কাজে ব্যবহার করতে না পারে। কৃষককে তার জমির পরিমাণ দেখে বিভিন্ন জাতের ধান শাকসবজি পাটসহ অন্যান্য ফসলের উন্নত বীজ প্রয়োজন মতো সরবরাহ করতে হবে। তারপর সার লাগবে, কীটনাশক লাগবে, আগাছা নিয়ন্ত্রণ, রোগবালাই দমন ও সেচ ব্যবস্থাপনা লাগবে। কৃষিতে এই পুরোটাই একটা প্রক্রিয়া। সেটা বীজ দিয়ে শুরু হয় এবং শস্য সংগ্রহ করে গোলায় সংরক্ষণের মধ্যদিয়ে শেষ হয়।

আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে, ‘এক ইঞ্চি জমিও যেন অনাবাদি না থাকে।’ এ ব্যাপারে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ ঘোষণা কৃষিখাতে ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসবে। তিনি সব সময় স্বপ্ন দেখেন দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূন্ণ করার পাশাপাশি অন্য দেশকেও খাদ্য দিয়ে সহযোগিতা করার। আর এটা বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে প্রথমে কৃষকের হাতে কৃষি উপকরণগুলো পৌঁছে দিতে হবে। এটা উন্নতমানের বীজ দিয়েই শুরু করতে হবে। এ বীজ কৃষক তার বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে সমতল অসমতল সমস্ত ভূমিতে চাষ করবে। এভাবেই আমাদেরকে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে।

বীজ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কৃষিগবেষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে বেসরকারী পর্যায়ে যেসব বীজ ও কৃষি উপকরণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে তারা কে কি ধরণের বীজ উৎপাদন করে এবং কি পরিমাণ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে সরকারকে তা আগে থেকেই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে নিশ্চিত হতে হবে। এক্ষেত্রে বীজ উৎপাদনকারী বা এসমস্ত কৃষি উপকরণ উৎপাদনকারীর উপকরণের মধ্যে প্রয়োজনে ভর্তুকি দিলে সেই ভর্তুকি পরোক্ষভাবে কৃষকই পাবেন। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, যদি এক কেজি হাইব্রিড ধানের বীজের দাম ৩ শত টাকা হয়, আর সরকার চায় এটি কৃষককে বিনামূল্যে দিতে। সেক্ষেত্রে সরকার কৃষি উপকরণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে আগাম অর্থ সহায়তা করবে আর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান উৎপাদন নিশ্চিত করে সরকারকে সরবরাহ করবে। আর সরকার উক্ত উপকরণ কৃষকের মাঝে বিনামূল্যে সরবরাহ করবে।

কৃষি উৎপাদনে ব্যাপকভাবে উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি গবেষণায় বায়োটেকনোলজিকেও গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান জানান মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ফার্মাসিটিকেল ইন্ডাস্ট্রির পাশাপাশি কৃষিখাতেও বায়োটেকনোলজির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ফসলের উন্নতমানের বীজ উৎপাদন করা সম্ভব। এ ছাড়াও এর মাধ্যমে বীজের জেনেটিক পরিবর্তন করে রোগবালাই মুক্ত বীজ উৎপাদন করা যায়। যেমন- এক ধরণের পোকা ধান গাছের ক্ষতি করে থাকে। সেগুলো দমনে বীজের বায়োলজি এমনভাবে পরিবর্তন হয়েছে যে সেখানে ফসলের অনিষ্টকারী পোকা আর আসতে পারবে না। ফসলটা তার কাছে তেতো লাগবে। ফলে ফসলের কোন ক্ষতি করতে পারে না।